সাবমেরিন ক্যাবল কিভাবে কাজ করে – ইন্টারনেটের অদৃশ্য মেরুদণ্ড

সাবমেরিন ক্যাবল কিভাবে কাজ করে

সাবমেরিন ক্যাবল কীভাবে কাজ করে, কেন সমুদ্রের নিচে বসানো হয়, বাংলাদেশে এর ভূমিকা ও ভবিষ্যৎ সহজ বাংলায় সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা।

ইন্টারনেট ব্যবহার করতে গিয়ে আমরা খুব কমই ভাবি এই ডেটা আসলে কোন পথ ধরে এক দেশ থেকে আরেক দেশে পৌঁছে। ভিডিও দেখা, কল করা বা ওয়েবসাইট ব্রাউজ করার পেছনে যে প্রযুক্তি সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে, সেটাই হলো Submarine Cable। আধুনিক বিশ্বে দ্রুত ও স্থিতিশীল ইন্টারনেট সংযোগের মূল ভিত্তি এই সাবমেরিন ক্যাবল। এই লেখায় সহজ ও চলিত বাংলায় জানবো সাবমেরিন ক্যাবল কীভাবে কাজ করে, কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ এবং বাংলাদেশের সঙ্গে এর সম্পর্ক।

সাবমেরিন ক্যাবল কিভাবে কাজ করে

ডেটা আদান–প্রদানের ক্ষেত্রে মূলত দুটি পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। একটি হলো ওয়্যার বা তারযুক্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অন্যটি হলো ওয়্যারলেস বা তারবিহীন যোগাযোগ। মোবাইল ডেটা, সিমের কল বা ওয়াই-ফাই ব্যবহার করলে তা ওয়্যারলেস যোগাযোগের উদাহরণ। আর ব্রডব্যান্ড বা অপটিক ফাইবার সংযোগ ব্যবহার করলে সেটি ওয়্যার যোগাযোগের অন্তর্ভুক্ত।

ওয়্যার যোগাযোগে সাধারণত গতি বেশি হয় এবং দীর্ঘ সময় স্থিতিশীল ইন্টারনেট পাওয়া যায়। অন্যদিকে ওয়্যারলেস যোগাযোগ চলাফেরার সুবিধা দিলেও খরচ বেশি এবং ডেটা সীমাবদ্ধ থাকে। এই কারণেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বড় ডেটা আদান–প্রদানের জন্য ওয়্যার যোগাযোগই সবচেয়ে কার্যকর, আর এখানেই সাবমেরিন ক্যাবলের প্রয়োজন।

সাবমেরিন ক্যাবল হলো সমুদ্রের নিচ দিয়ে বসানো বিশেষ ধরনের অপটিক ফাইবার তার, যার মাধ্যমে এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে ডেটা পাঠানো হয়। পৃথিবীর প্রায় সব আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ট্রাফিক এই সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমেই চলাচল করে।

সাবমেরিন ক্যাবল কীভাবে কাজ করে

ফাইবার-অপটিক প্রযুক্তির ভূমিকা

সাবমেরিন ক্যাবলে ব্যবহৃত হয় ফাইবার-অপটিক প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তিতে খুব সূক্ষ্ম ও স্বচ্ছ কাচের তন্তুর ভেতর দিয়ে আলোর সংকেত পাঠানো হয়। ডেটাকে প্রথমে আলোক সংকেতে রূপান্তর করা হয়, তারপর সেই আলো কাচের ভেতরে পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের মাধ্যমে বহু দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়।

এই পদ্ধতিতে ডেটা খুব দ্রুত যায় এবং ক্ষয়ও হয় কম। তাই হাজার হাজার কিলোমিটার দূরেও ইন্টারনেট সংযোগ কার্যকর থাকে।

ক্যাবলের গঠন

একটি সাবমেরিন ক্যাবলের ভেতরে একাধিক স্তর থাকে। মাঝখানে থাকে ফাইবার কোর, তার চারপাশে সুরক্ষার জন্য বিশেষ কোটিং, ধাতব স্তর এবং শক্ত আবরণ। এসব স্তর ক্যাবলকে চাপ, পানি এবং বাহ্যিক আঘাত থেকে রক্ষা করে।

অনেকে প্রশ্ন করেন, আকাশপথে বা স্থলপথে ক্যাবল বসানো গেলেও কেন সমুদ্রের নিচে বসানো হয়। এর প্রধান কারণ হলো খরচ ও স্থায়িত্ব। আকাশপথে বা স্থলে দীর্ঘ দূরত্বে ক্যাবল বসাতে গেলে প্রচুর খরচ হয় এবং রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক জটিলতাও থাকে। সমুদ্রের নিচে একবার ক্যাবল বসাতে পারলে তুলনামূলক কম খরচে বহু দেশের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করা যায়।

সাবমেরিন ক্যাবলের ইতিহাস

সাবমেরিন ক্যাবলের ইতিহাস প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ইউরোপ ও ইংল্যান্ডের মধ্যে টেলিগ্রাম যোগাযোগের জন্য প্রথম সাবসি ক্যাবল বসানো হয়। ১৮৫৬ সালে Atlantic Telegraph Company প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৮৫৮ সালে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রথম ট্রান্সঅ্যাটলান্টিক ক্যাবল চালু হয়।

সেই সময় একটি বার্তা পাঠাতে প্রায় ১৬ ঘণ্টা সময় লাগত। যদিও এই ক্যাবল বেশিদিন টেকেনি, তবে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক যোগাযোগের পথ খুলে দিয়েছিল।

আধুনিক সাবমেরিন ক্যাবল

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তির উন্নতির ফলে সাবমেরিন ক্যাবল এখন অনেক বেশি শক্তিশালী ও দ্রুত হয়েছে। বর্তমানে SEA-ME-WE ধরনের ক্যাবল হাজার হাজার মাইল দীর্ঘ এবং একসঙ্গে বহু দেশকে সংযুক্ত করে। এসব ক্যাবলের মাধ্যমে প্রতি সেকেন্ডে বিপুল পরিমাণ ডেটা আদান–প্রদান সম্ভব।

বাংলাদেশ ও সাবমেরিন ক্যাবল

বাংলাদেশে সাবমেরিন ক্যাবলের যাত্রা শুরু হয় ২০০৮ সালে। Bangladesh Submarine Cable Company Limited বা BSCCL এর মাধ্যমে দেশ প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়। SEA-ME-WE 4 এবং SEA-ME-WE 5 ক্যাবলের মাধ্যমে বাংলাদেশ দ্রুতগতির ইন্টারনেট সুবিধা পেতে শুরু করে।

এই সংযোগের ফলে দেশে আইটি, ফ্রিল্যান্সিং, আউটসোর্সিং এবং ডিজিটাল সেবার ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে।

আজকের ডিজিটাল বিশ্বে সাবমেরিন ক্যাবল ছাড়া ইন্টারনেট কল্পনাই করা যায় না। সামাজিক যোগাযোগ, অনলাইন শিক্ষা, ই-কমার্স, ব্যাংকিং থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক কল—সবকিছুই এই ক্যাবলের ওপর নির্ভরশীল। ওয়্যারলেস প্রযুক্তি থাকলেও কম খরচে ও আনলিমিটেড ডেটার জন্য সাবমেরিন ক্যাবলই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য।

ক্যাবলের রক্ষণাবেক্ষণ ও ঝুঁকি

একটি সাবমেরিন ক্যাবলের আয়ুষ্কাল সাধারণত ২৫ বছর। তবে ভূমিকম্প, ঝড় বা জাহাজের নোঙরের আঘাতে ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ক্যাবল কেটে গেলে সেটি খুঁজে বের করে মেরামত করতে সময় লাগে, কারণ কাজটি করতে হয় গভীর সমুদ্রে বিশেষ জাহাজ ও দক্ষ ইঞ্জিনিয়ারের সাহায্যে।

আগে শুধু টেলিকম কোম্পানিগুলো সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপন ও পরিচালনা করত। এখন গুগল, মাইক্রোসফট, অ্যামাজন, মেটার মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানও নিজস্ব ক্যাবল বসাচ্ছে। এর কারণ হলো তাদের সার্ভিস যেন দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য থাকে।

স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ও অন্যান্য প্রযুক্তি উন্নত হলেও এখনো সাবমেরিন ক্যাবলই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। ভবিষ্যতে আরও উন্নত ফাইবার প্রযুক্তির মাধ্যমে ডেটা গতি বাড়বে এবং বিশ্ব আরও কাছাকাছি আসবে।

প্রশ্ন–উত্তর

পৃথিবীতে কতটি সাবমেরিন ক্যাবল আছে

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে চারশোর বেশি সক্রিয় সাবমেরিন ক্যাবল রয়েছে এবং সংখ্যা বাড়ছে।

ক্যাবল ম্যাপ কি সঠিক অবস্থান দেখায়

না, নিরাপত্তার কারণে ম্যাপে আনুমানিক অবস্থান দেখানো হয়।

সাবমেরিন ক্যাবলের বিকল্প আছে কি

স্যাটেলাইট ও ড্রোন প্রযুক্তি বিকল্প হিসেবে আছে, তবে খরচ ও সক্ষমতার দিক থেকে এখনো সাবমেরিন ক্যাবল এগিয়ে।

সাবমেরিন ক্যাবল আধুনিক ইন্টারনেট ব্যবস্থার নীরব নায়ক। আমরা চোখে না দেখলেও প্রতিদিন এর ওপর নির্ভর করেই ডিজিটাল জীবন চলছে। দ্রুত, সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য যোগাযোগের জন্য সাবমেরিন ক্যাবলের গুরুত্ব ভবিষ্যতেও অপরিসীম থাকবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shopping Cart
Scroll to Top
0