বর্তমান সময়ে ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে ডেনমার্ক অন্যতম এক আকর্ষণের নাম। পৃথিবীর সুখী দেশগুলোর তালিকায় একেবারে উপরের দিকে থাকা এই দেশটিতে নিজের ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন দেখেন অনেকেই। বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে যারা ইউরোপে সেটেল হতে চান, তাদের পছন্দের তালিকায় ডেনমার্ক থাকে শীর্ষে। তবে ডেনমার্কে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেই তো হবে না, জানতে হবে সঠিক নিয়ম এবং খরচের হিসাব। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা আলোচনা করব বাংলাদেশ থেকে ডেনমার্ক ওয়ার্ক পারমিট ভিসা খরচ এবং এর খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে। আপনি যদি এই বিষয়টি নিয়ে সিরিয়াস হয়ে থাকেন, তবে পুরো লেখাটি মনোযোগ দিয়ে পড়ুন।
ডেনমার্ক শুধু ইউরোপ মহাদেশের একটি উন্নত দেশই নয়, বরং জীবনযাত্রার মান এবং কর্মপরিবেশের দিক দিয়ে এটি অপ্রতিদ্বন্দ্বী। দেশটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং সেনজেনভুক্ত হওয়ায় এখানে কাজ করার সুবিধা অনেক। একজন কর্মী হিসেবে আপনি এখানে শুধু উচ্চ বেতনই পাবেন না, বরং পাবেন চমৎকার সব সামাজিক সুযোগ-সুবিধা।
দেশটি শিল্পে অত্যন্ত উন্নত হওয়ায় বিভিন্ন সেক্টরে প্রচুর কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ইঞ্জিনিয়ারিং, আইটি, হেলথ কেয়ার থেকে শুরু করে কৃষি—প্রায় সব খাতেই দক্ষ জনশক্তির চাহিদা রয়েছে। এছাড়া ডেনমার্কের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত স্থিতিশীল এবং পরিবেশ খুবই শান্তপূর্ণ, যা একজন প্রবাসীর জন্য নিরাপদ বসবাসের নিশ্চয়তা দেয়।
বাংলাদেশ থেকে ডেনমার্ক ওয়ার্ক পারমিট ভিসা খরচ কত?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ডেনমার্ক যেতে আসলে কত টাকা লাগে? সত্যি বলতে, ডেনমার্ক ওয়ার্ক পারমিট ভিসা খরচ নির্ভর করে আপনি কোন ক্যাটাগরিতে এবং কোন প্রক্রিয়ায় আবেদন করছেন তার ওপর। সাধারণত সরকারি ফি এবং আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে একটি নির্দিষ্ট অংক থাকে, কিন্তু আপনি যদি কোনো এজেন্সির মাধ্যমে যান তবে খরচ কিছুটা বাড়তে পারে।
ডেনমার্কের ইমিগ্রেশন সার্ভিস বা SIRI-এর নিয়ম অনুযায়ী, ওয়ার্ক পারমিট আবেদনের জন্য একটি নির্দিষ্ট প্রসেসিং ফি দিতে হয়। বর্তমানে ডেনমার্কের ভিসা অ্যাপ্লিকেশনের অফিসিয়াল ফি বা Case Order ID ফি প্রায় ৪,৬৭৫ ড্যানিশ ক্রোন (DKK), যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৮০,০০০ টাকার আশেপাশে হতে পারে (বিনিময় হারের ওপর ভিত্তি করে পরিবর্তনশীল)।
তবে এর বাইরেও বেশ কিছু খরচ রয়েছে। যেমন: ১. বায়োমেট্রিক বা এম্বাসি ফি। ২. বিমান ভাড়া (যা সিজনভেদে কম-বেশি হয়)। ৩. ট্রাভেল ইন্স্যুরেন্স। ৪. প্রাথমিক অবস্থায় ডেনমার্কে গিয়ে থাকা-খাওয়ার খরচ।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশ থেকে একজন প্রার্থীর ডেনমার্ক পৌঁছানো পর্যন্ত আনুমানিক ৮ থেকে ১২ লাখ টাকার মতো খরচ হতে পারে। তবে এটি একটি ধারণা মাত্র। আপনার স্কিল এবং এমপ্লয়ারের সাথে চুক্তির ওপর ভিত্তি করে এই খরচ কম বা বেশি হতে পারে। অনেক সময় কোম্পানি কর্মীদের বিমান ভাড়া ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করে থাকে, সেক্ষেত্রে আপনার খরচ অনেকটাই কমে আসবে।
ডেনমার্ক ওয়ার্ক পারমিট ভিসার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
ডেনমার্কে কাজের ভিসা প্রসেসিং করার জন্য আপনার ডকুমেন্টস বা কাগজপত্র শতভাগ সঠিক হওয়া চাই। সামান্য ভুলের কারণেও ভিসা রিজেক্ট হতে পারে। নিচে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের একটি তালিকা দেওয়া হলো যা আপনার প্রস্তুত রাখতে হবে:
- পাসপোর্ট: কমপক্ষে ৬ মাস মেয়াদী এবং পর্যাপ্ত খালি পাতা থাকতে হবে।
- ছবি: সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডের সদ্য তোলা পাসপোর্ট সাইজের ছবি।
- ভোটার আইডি কার্ড: জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি কার্ডের কপি।
- ইউরোপিয়ান স্টাইল সিভি (Europass CV): ইউরোপের চাকরির বাজারের জন্য সাধারণ সিভি চলে না, আপনাকে অবশ্যই Europass ফরমেটে সিভি তৈরি করতে হবে।
- শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ: আপনার সমস্ত একাডেমিক সার্টিফিকেট এবং ট্রান্সক্রিপ্ট।
- স্কিল সার্টিফিকেট: আপনি যে কাজের জন্য যাচ্ছেন, সেই কাজের ওপর কোনো ট্রেনিং বা দক্ষতা থাকলে তার সনদ।
- কাজের অভিজ্ঞতার সার্টিফিকেট (Experience Certificate): পূর্ববর্তী কাজের অভিজ্ঞতা প্রমাণপত্র।
- কাজের অফার লেটার (Job Offer Letter): ডেনিশ কোনো কোম্পানির দেওয়া বৈধ চাকরির প্রস্তাবপত্র।
- ওয়ার্ক পারমিট: ইমিগ্রেশন থেকে ইস্যু করা ওয়ার্ক পারমিট কপি।
- মেডিকেল রিপোর্ট সার্টিফিকেট: শারীরিক ফিটনেসের প্রমাণ।
- পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট: আপনার নামে কোনো ক্রিমিনাল রেকর্ড নেই তার প্রমাণপত্র।
- ভিসা আবেদন ফর্ম: সঠিকভাবে পূরণ করা আবেদনপত্র।
- IELTS স্কোর: যদিও সব ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক নয়, তবে দক্ষ কর্মীদের জন্য ইংরেজি ভাষার দক্ষতা থাকাটা প্লাস পয়েন্ট।
ডেনমার্কে কাজের সুযোগ ও সুবিধা
ডেনমার্কে কাজ করার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এখানকার বেতন কাঠামো। এটি একটি উচ্চ আয়ের দেশ, তাই এখানে সাধারণ কাজের বেতনও বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বেশি। এছাড়া এখানে শ্রমিকদের অধিকার খুব কড়াকড়িভাবে রক্ষা করা হয়।
সেনজেন সুবিধা: ডেনমার্ক সেনজেন অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। এর মানে হলো, আপনি ডেনমার্কের ভিসা বা রেসিডেন্স পারমিট থাকলে ইউরোপের আরও ২৯টি দেশে ভিসা ছাড়াই ভ্রমণ করতে পারবেন। এটি ভ্রমণপিপাসুদের জন্য বিশাল এক সুযোগ।
বিনামূল্যে উচ্চশিক্ষা: আপনি যদি দীর্ঘমেয়াদী বসবাসের অনুমতি পান, তবে অনেক ক্ষেত্রে নিজের বা সন্তানদের পড়াশোনার জন্য সরকারি সুবিধা পেতে পারেন। ডেনমার্কের শিক্ষা ব্যবস্থা বিশ্বমানের।
বিশ্বমানের স্বাস্থ্যসেবা: ডেনমার্কে যারা বৈধভাবে বসবাস করেন এবং কর প্রদান করেন, তারা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে উন্নতমানের স্বাস্থ্যসেবা পেয়ে থাকেন। এখানকার হাসপাতাল এবং চিকিৎসা ব্যবস্থা অত্যন্ত আধুনিক।
সামাজিক নিরাপত্তা ও লিঙ্গ সমতা: ডেনমার্কে নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়। কর্মক্ষেত্রে কোনো বৈষম্য করা হয় না। এছাড়া বেকারত্ব ভাতা, শিশু ভাতা এবং বয়স্ক ভাতার মতো চমৎকার সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে।
ডেনমার্কে নাগরিকত্ব পাওয়ার নিয়ম ও শর্ত
অনেকেই স্বপ্ন দেখেন শুধু কাজ নয়, ডেনমার্কে স্থায়ীভাবে বসবাস করবেন এবং নাগরিকত্ব পাবেন। ডেনমার্কে নাগরিকত্ব বা Citizenship পাওয়ার প্রক্রিয়াটি একটু দীর্ঘ কিন্তু অসম্ভব নয়।
সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, ডেনমার্কে বৈধভাবে টানা ৯ বছর বসবাস করলে আপনি নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারবেন। তবে এই সময়ে আপনার বসবাসের রেকর্ড স্বচ্ছ হতে হবে।
তাছাড়া, বিয়ের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়ার একটি সুযোগ রয়েছে। যদি কোনো প্রবাসী বৈধভাবে বসবাসরত অবস্থায় কোনো ড্যানিশ নাগরিককে বিয়ে করেন, তবে বিয়ের তিন বছর পর এবং ডেনমার্কে নির্দিষ্ট সময় বসবাসের শর্ত পূরণ করে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারেন।
নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য আরও কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়: ১. ভাষা শিক্ষা: ড্যানিশ ভাষা জানা নাগরিকত্বের জন্য আবশ্যিক। আপনাকে নির্দিষ্ট লেভেলের ভাষা পরীক্ষায় পাস করতে হবে। ২. স্বচ্ছ রেকর্ড: আপনার নামে কোনো বড় ধরনের ব্যাংক লোন খেলাপি বা ক্রিমিনাল রেকর্ড থাকা যাবে না। ৩. আর্থিক সচ্ছলতা: আপনি গত কয়েক বছর ধরে সরকারি সাহায্য ছাড়া নিজের আয়ে চলছেন, এমন প্রমাণ দেখাতে হবে।
ডেনমার্কে চাকরির আবেদন করবেন কীভাবে?
এখন প্রশ্ন হলো, চাকরি খুঁজবেন কোথায়? বর্তমানে অনলাইনের যুগে ঘরে বসেই ডেনমার্কের বিভিন্ন জজ পোর্টালে আবেদন করা যায়। LinkedIn, Jobindex, Work in Denmark এর মতো ওয়েবসাইটগুলোতে নিয়মিত চোখ রাখতে হবে। সেখানে আপনার যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেখলে সুন্দর একটি কভার লেটার এবং Europass CV দিয়ে আবেদন করতে হবে।
মনে রাখবেন, কোনো দালাল বা ভুয়া এজেন্সির প্রলোভনে পড়বেন না। সরাসরি কোম্পানির সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করুন অথবা বিশ্বস্ত কোনো ইমিগ্রেশন কনসালটেন্সির সহায়তা নিন। চাকরির অফার লেটার হাতে পাওয়ার পরই কেবল টাকার লেনদেন বা পরবর্তী ধাপগুলো নিয়ে চিন্তা করা উচিত।
প্রশ্ন-উত্তর (FAQ)
প্রশ্ন: ডেনমার্ক যেতে কত বছর বয়স লাগে? উত্তর: সাধারণত ১৮ বছরের উপরে যে কেউ ওয়ার্ক পারমিটের জন্য আবেদন করতে পারেন। তবে ২৫ থেকে ৪০ বছর বয়সীদের চাকরির সুযোগ বেশি থাকে।
প্রশ্ন: ইংরেজি জানা কি বাধ্যতামূলক? উত্তর: ডেনমার্কে অফিসিয়াল ভাষা ড্যানিশ হলেও কর্মক্ষেত্রে ইংরেজির প্রচুর ব্যবহার রয়েছে। তাই IELTS স্কোর থাকলে আপনার গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে, তবে সব চাকরিতে এটি বাধ্যতামূলক নয়।
প্রশ্ন: ডেনমার্কে ন্যূনতম বেতন কত? উত্তর: ডেনমার্কে সরকারিভাবে কোনো নির্দিষ্ট ন্যূনতম বেতন নেই, তবে ট্রেড ইউনিয়ন এবং এমপ্লয়ারের চুক্তির ওপর ভিত্তি করে একজন সাধারণ কর্মীও মাসে ২০,০০০ থেকে ৩০,০০০ ড্যানিশ ক্রোন বা তার বেশি আয় করতে পারেন।
ইউরোপের অন্যতম সমৃদ্ধ দেশ ডেনমার্কে ক্যারিয়ার গড়া একটি চমৎকার সিদ্ধান্ত হতে পারে। যদিও ডেনমার্ক ওয়ার্ক পারমিট ভিসা খরচ এবং প্রক্রিয়াটি কিছুটা সময়সাপেক্ষ, তবে সঠিক প্রস্তুতি এবং ধৈর্যের সাথে এগোলে সফলতা আসবেই। দালালদের চটকদার বিজ্ঞাপনে না ভুলে নিজে তথ্য যাচাই করুন এবং সঠিক উপায়ে আবেদন করুন। আপনার দক্ষতা এবং যোগ্যতা থাকলে ডেনমার্কের মতো দেশে আপনার ভবিষ্যৎ হবে উজ্জ্বল।
আজই আপনার পাসপোর্ট, সিভি এবং অন্যান্য নথিপত্র গুছিয়ে প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করুন। শুভকামনা আপনার ডেনমার্ক যাত্রার জন্য।


