সূর্যোদয়ের দেশ জাপান শুধু তার বিশাল অর্থনীতির জন্যই নয়, বরং উন্নত প্রযুক্তি, নান্দনিক সৌন্দর্য এবং সুশৃঙ্খল জীবনযাত্রার জন্যও বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। এশিয়ার মধ্যে শান্তিপ্রিয় ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন দেশ হিসেবে জাপানের খ্যাতি সবার শীর্ষে। উন্নত ক্যারিয়ার, উচ্চশিক্ষা কিংবা নিছক ভ্রমণের জন্য প্রতি বছর হাজার হাজার বাংলাদেশি এই দেশটিতে পাড়ি জমাতে চান। কিন্তু সঠিক তথ্যের অভাবে অনেকেই দালালের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হন। তাই আপনার মনে যদি প্রশ্ন থাকে, বাংলাদেশ থেকে জাপান যেতে কত টাকা লাগে, তবে এই আর্টিকেলটি আপনার জন্য।
২০২৬ সালের সর্বশেষ আপডেট অনুযায়ী, জাপান যাওয়ার খরচ ভিসা ক্যাটাগরি ভেদে ভিন্ন হয়। আপনি স্টুডেন্ট ভিসা, টুরিস্ট ভিসা কিংবা ওয়ার্ক পারমিট—যে মাধ্যমেই যেতে চান না কেন, খরচের একটি স্বচ্ছ ধারণা থাকা জরুরি। এই আর্টিকেলে আমরা জাপানে যাওয়ার খরচ, বয়স সীমা, বিমান ভাড়া এবং ভিসা প্রসেসিং নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব, যাতে আপনি কোনো বিভ্রান্তি ছাড়াই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
জাপানে কেন যাবেন এবং বর্তমান পরিস্থিতি
জাপান বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ। এখানে শিক্ষার মান যেমন উন্নত, তেমনি কর্মসংস্থানের সুযোগও প্রচুর। বিশেষ করে জাপানের জনসংখ্যা হ্রাসের কারণে তারা বর্তমানে বিদেশ থেকে প্রচুর দক্ষ কর্মী ও স্টুডেন্ট নিচ্ছে। তবে মনে রাখবেন, জাপানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আর্থিক প্রস্তুতির বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
অনেকেই ইন্টারনেটে বাংলাদেশ থেকে জাপান যেতে কত টাকা লাগে লিখে সার্চ করেন, কিন্তু একেক জায়গায় একেক রকম তথ্য দেখে বিভ্রান্ত হন। সরকারিভাবে যাওয়ার খরচ একরকম, আবার বেসরকারি এজেন্সির মাধ্যমে গেলে খরচ বেড়ে যায় কয়েকগুণ। তাই যাত্রার শুরুতেই বাজেট সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ থেকে জাপান যেতে কত টাকা লাগে? (ভিসা ক্যাটাগরি অনুযায়ী)
জাপান যাওয়ার খরচ মূলত নির্ভর করে আপনি কোন ভিসায় যাচ্ছেন এবং কার মাধ্যমে প্রসেসিং করছেন তার ওপর। সরকারিভাবে বা জি-টু-জি (G2G) পদ্ধতিতে যেতে পারলে খরচ অনেক কম হয়। কিন্তু বেসরকারি এজেন্সি বা দালালদের মাধ্যমে গেলে এই খরচ আকাশচুম্বী হতে পারে।
সহজ কথায়, স্টুডেন্ট ভিসার জন্য খরচ এবং ওয়ার্ক পারমিট ভিসার খরচ সম্পূর্ণ আলাদা। নিচে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে জাপানের ভিসা খরচের একটি আনুমানিক হিসাব দেওয়া হলো।
১. স্টুডেন্ট ভিসায় জাপান যাওয়ার খরচ
বর্তমানে বাংলাদেশি তরুণ-তরুণীদের মাঝে জাপানে উচ্চশিক্ষার প্রবল আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। জাপানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান বিশ্বমানের এবং পড়াশোনার পাশাপাশি পার্ট-টাইম জবের সুযোগ থাকায় এটি শিক্ষার্থীদের প্রথম পছন্দ।
স্টুডেন্ট ভিসার ক্ষেত্রে খরচের প্রধান খাতগুলো হলো— ল্যাঙ্গুয়েজ স্কুলের টিউশন ফি, হোস্টেল ফি, এবং প্রসেসিং চার্জ।
- বর্তমান খরচ: বর্তমানে স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে বাংলাদেশ থেকে জাপানে যেতে আনুমানিক ৫ লক্ষ থেকে ৮ লক্ষ টাকা লাগে।
- খরচের বিবরণ: এর মধ্যে ১ বছরের টিউশন ফি, ৩-৬ মাসের থাকা-খাওয়ার খরচ এবং বিমান ভাড়া অন্তর্ভুক্ত থাকে। তবে আপনি যদি স্কলারশিপ ম্যানেজ করতে পারেন, তবে এই খরচ আরও কমে আসবে।
২. ওয়ার্ক পারমিট বা কাজের ভিসায় জাপান যাওয়ার খরচ
জাপানে কাজের ভিসায় যাওয়াটা অনেকের আজন্ম স্বপ্ন। বিশেষ করে ‘স্পেসিফাইড স্কিলড ওয়ার্কার’ (SSW) ভিসার চাহিদা এখন তুঙ্গে। তবে এই সেক্টরেই মানুষ সবচেয়ে বেশি প্রতারণার শিকার হয়।
- সরকারি খরচ: সরকারিভাবে বোয়েসেল (BOESL)-এর মাধ্যমে জাপান যেতে পারলে খরচ খুবই নগণ্য।
- বেসরকারি খরচ: বেসরকারিভাবে বা এজেন্সির মাধ্যমে ওয়ার্ক পারমিট ভিসা নিয়ে বাংলাদেশ থেকে জাপানে যেতে বর্তমানে আনুমানিক ১০ লক্ষ থেকে ১৫ লক্ষ টাকা লাগে।
- অনেক সময় দালালরা এর চেয়েও বেশি টাকা দাবি করে। তাই টাকা লেনদেনের আগে অবশ্যই বৈধ ট্রাভেল এজেন্সির সাথে যোগাযোগ করুন এবং তাদের লাইসেন্স যাচাই করে নিন।
৩. টুরিস্ট বা ভিজিট ভিসা খরচ
জাপানে ভিজিট ভিসা পাওয়াটা কিছুটা কঠিন এবং চ্যালেঞ্জিং। আপনার ব্যাংক সলভেন্সি এবং ট্রাভেল হিস্ট্রি ভালো না থাকলে এই ভিসা পাওয়া দুষ্কর।
- খরচ: সাধারণত টুরিস্ট ভিসার এমবসি ফি কম। কিন্তু এজেন্সির মাধ্যমে প্রসেসিং এবং ইনভাইটেশন লেটার ম্যানেজ করে বাংলাদেশ থেকে জাপানে ভিজিট ভিসা নিয়ে যেতে আনুমানিক ১০ লক্ষ থেকে ১৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে (প্যাকেজ ভেদে)।
সহজভাবে বোঝার জন্য নিচে একটি তালিকা দেওয়া হলো:
| ভিসার ধরন | আনুমানিক খরচ (টাকা) | মন্তব্য |
| স্টুডেন্ট ভিসা | ৫,০০,০০০ – ৮,০০,০০০ | টিউশন ফি ও প্রসেসিং সহ |
| ওয়ার্ক পারমিট | ১০,০০,০০০ – ১৫,০০,০০০ | বেসরকারি বা এজেন্সি রেট |
| টুরিস্ট/ভিজিট ভিসা | ১০,০০,০০০ – ১৫,০০,০০০ | এজেন্সি প্যাকেজ রেট |
সতর্কবার্তা: জাপানে যেতে কত টাকা লাগে এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর পেতে একজন অভিজ্ঞ জাপানি প্রবাসীর সহযোগিতা নিন অথবা সরাসরি জাপানিজ এম্বাসির ওয়েবসাইট ভিজিট করুন।
জাপান যেতে কত বছর বয়স লাগে ২০২৬?
টাকা বা খরচের পাশাপাশি বয়সের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনার বয়স যদি সীমার মধ্যে না থাকে, তবে টাকা খরচ করেও ভিসা পাওয়া সম্ভব নয়। জাপান ভিসা আবেদনকারীদের জাপানে যেতে কত বছর বয়স লাগে সেটা নির্ভর করে ভিসা ক্যাটাগরির উপর।
২০২৬ সালের নিয়ম অনুযায়ী বয়সের সময়সীমা নিচে দেওয়া হলো:
- কাজের ভিসা (Work Visa): কাজের ভিসা নিয়ে জাপানে যেতে আবেদনকারীদের বয়স সীমা ১৮ বছর থেকে ৩০ বছরের মধ্যে হতে হবে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বা বিশেষ দক্ষতায় বয়সের শিথিলতা থাকতে পারে, তবে তরুণদের অগ্রাধিকার বেশি।
- স্টুডেন্ট ভিসা (Student Visa): স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে জাপানে যেতে আগ্রহীদের স্নাতক প্রোগ্রামে ভর্তি হতে নূন্যতম বয়স ১৮ বছর হতে হবে এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি প্রোগ্রামে ভর্তি হতে ন্যূনতম বয়স ২১ বছর হতে হবে। পড়াশোনায় গ্যাপ বেশি থাকলে ভিসা পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।
- বিজনেস ভিসা: বিজনেস ভিসাধারীদের ক্ষেত্রে ন্যূনতম বয়স ২১ বছর হতে হবে।
- টুরিস্ট ভিসা: টুরিস্ট ভিসা আবেদনকারীদের বয়সের কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই। শিশু থেকে বৃদ্ধ যে কেউ ভিজিট ভিসায় জাপান যেতে পারেন।
বাংলাদেশ থেকে জাপানে যেতে কত সময় লাগে ও বিমান ভাড়া
ভিসা প্রসেসিং শেষ হওয়ার পর আসে বিমান টিকেটের পালা। বাংলাদেশ থেকে জাপানে সরাসরি এবং কানেক্টিং—উভয় ধরণের ফ্লাইট চালু রয়েছে।
ফ্লাইটের সময়কাল
- সরাসরি ফ্লাইট: বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের (বিমান বাংলাদেশ) সরাসরি ফ্লাইটে করে বাংলাদেশ থেকে জাপানে যেতে বর্তমানে আনুমানিক প্রায় ৬ ঘন্টা সময় লাগে। এটি নারিতা রুটে চলাচল করে।
- কানেক্টিং ফ্লাইট: অন্য এয়ারলাইন্সের (যেমন- থাই এয়ারওয়েজ, সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স) ফ্লাইটে গেলে ট্রানজিটসহ ১২ ঘন্টা থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগে।
বিমান ভাড়ার ধারণা
বিমান ভাড়া সবসময় ওঠানামা করে। তবে একটি সাধারণ ধারণা রাখা ভালো। বাংলাদেশ থেকে জাপানে যাওয়ার টিকিটের মূল্য তুলনামূলক কম, কিন্তু ফেরার টিকিটের মূল্য বেশি।
- ঢাকা টু নারিতা: ঢাকা থেকে নারিতা রুটের একমুখী সর্বনিম্ন বিমান ভাড়া জনপ্রতি প্রায় ৭০ হাজার ৮২৮ টাকা (সময়ভেদে পরিবর্তনযোগ্য)।
- রিটার্ন টিকেট: ফিরতি টিকিটের মূল্য আনুমানিক ১ লাখ ১১ হাজার ৬৫৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সিজন অনুযায়ী এই ভাড়া কম বা বেশি হতে পারে। তাই টিকেট কাটার ১-২ মাস আগে বুকিং দিলে কিছুটা সাশ্রয় করা সম্ভব।
জাপান যাওয়ার আগে কিছু প্রয়োজনীয় টিপস (E-E-A-T)
যেহেতু আপনি এখন জানেন বাংলাদেশ থেকে জাপান যেতে কত টাকা লাগে, তাই পরবর্তী পদক্ষেপগুলো সাবধানে নেওয়া উচিত। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং গবেষণালব্ধ কিছু টিপস নিচে দেওয়া হলো:
- ভাষা শিখুন: জাপানে যাওয়ার জন্য জাপানি ভাষা (N5 বা N4 লেভেল) জানাটা প্রায় বাধ্যতামূলক। ভাষা জানলে আপনার ভিসা পাওয়ার সম্ভাবনা ৯০% বেড়ে যায়।
- সঠিক এজেন্সি বাছাই: চটকদার বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ হবেন না। সরকার অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সি বা বোয়েসেলের মাধ্যমে চেষ্টা করুন।
- ডকুমেন্টেশন: আপনার শিক্ষাগত যোগ্যতা, ব্যাংকের নথিপত্র এবং কাজের অভিজ্ঞতার সনদপত্র সব আসল হতে হবে। জাপানিরা মিথ্যার ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে।
- শারীরিক ফিটনেস: কাজের ভিসার জন্য মেডিকেল ফিটনেস খুব জরুরি।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. সরকারিভাবে জাপান যেতে কত টাকা লাগে?
সরকারিভাবে বোয়েসেল বা টেকনিক্যাল ইন্টার্ন প্রোগ্রামের মাধ্যমে জাপান গেলে খরচ অনেক কম হয়। সেক্ষেত্রে ১ লক্ষ থেকে ২ লক্ষ টাকার মধ্যেই যাওয়া সম্ভব হতে পারে। তবে এটি লটারি বা বিশেষ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির ওপর নির্ভর করে।
২. জাপান যেতে কি ব্যাংক ব্যালেন্স দেখাতে হয়?
হ্যাঁ, বিশেষ করে স্টুডেন্ট এবং টুরিস্ট ভিসার জন্য আপনাকে স্পন্সরের ব্যাংক সলভেন্সি দেখাতে হবে। স্টুডেন্ট ভিসার জন্য সাধারণত ১৫-২০ লক্ষ টাকার ব্যাংক ব্যালেন্স দেখানো নিরাপদ।
৩. জাপানে ন্যূনতম বেতন কত?
জাপানে কাজের ধরন ও এলাকাভেদে বেতন ভিন্ন হয়। তবে একজন সাধারণ কর্মী মাসে বাংলাদেশি টাকায় ১ লক্ষ ৫০ হাজার থেকে ২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন। ওভারটাইম করলে এই আয় আরও বাড়ে।
৪. শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়া কি জাপান যাওয়া যায়?
স্কিলড ওয়ার্কার ভিসার জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং জাপানি ভাষার দক্ষতা প্রয়োজন। তবে কিছু কনস্ট্রাকশন বা কৃষি কাজে শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করা হতে পারে, কিন্তু ভাষা জানাটা জরুরি।
৫. বর্তমানে জাপানের ভিসা কি চালু আছে?
হ্যাঁ, ২০২৬ সালেও বাংলাদেশ থেকে জাপানের সব ধরনের ভিসা (স্টুডেন্ট, ওয়ার্ক, টুরিস্ট) চালু রয়েছে।
জাপান একটি স্বপ্নের দেশ, কিন্তু সেই স্বপ্নে পৌঁছানোর পথটি হতে হবে স্বচ্ছ ও সঠিক। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা আলোচনা করেছি বাংলাদেশ থেকে জাপান যেতে কত টাকা লাগে, বয়স সীমা এবং বিমান ভাড়ার খুঁটিনাটি। মনে রাখবেন, দালালের প্রলোভনে পড়ে শর্টকাট খুঁজবেন না। সঠিক ভাষা শিক্ষা এবং দক্ষতা অর্জন করতে পারলে জাপান আপনার ক্যারিয়ার গড়তে সেরা গন্তব্য হতে পারে।
আপনি যদি স্টুডেন্ট ভিসা বা ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে জাপান যাওয়ার পরিকল্পনা করে থাকেন, তবে আজই জাপানি ভাষা শেখা শুরু করুন এবং বৈধ ট্রাভেল এজেন্সির সাথে পরামর্শ করুন।
আপনার কি জাপান ভিসা নিয়ে আরও কোনো প্রশ্ন আছে? নিচে কমেন্ট করে আমাদের জানান, আমরা আপনার উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব।
(ডিসক্লেইমার: এই আর্টিকেলের তথ্যাদি বর্তমান বাজার দর ও বিভিন্ন সূত্রের ভিত্তিতে তৈরি। ডলার রেট ও পলিসি পরিবর্তনের সাথে সাথে খরচ কম-বেশি হতে পারে। যেকোনো আর্থিক লেনদেনের আগে অবশ্যই যাচাই-বাছাই করে নিন।)


