২০২৬ সালে ইতালি স্পন্সর ভিসা আবেদনের সময়সূচী, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, খরচ এবং ধাপে ধাপে প্রক্রিয়া জানুন। বাংলাদেশ থেকে ইতালিতে কাজের সুযোগ খুঁজছেন? এই গাইডটি আপনার সব প্রশ্নের উত্তর দেবে।
ইতালি, ইউরোপের একটি সুন্দর দেশ, যেখানে অর্থনীতি শক্তিশালী এবং চাকরির সুযোগ প্রচুর। বিশেষ করে কৃষি, নির্মাণ, হসপিটালিটি এবং পরিবহন খাতে শ্রমিকের চাহিদা বাড়ছে। ২০২৬ সালে ইতালির সরকার ১ লক্ষ ৬৫ হাজার বিদেশি শ্রমিক আমদানির পরিকল্পনা করেছে, যার মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্যও বিশেষ সুযোগ রয়েছে। এই সুযোগের মূল চাবিকাঠি হলো ইতালি স্পন্সর ভিসা ২০২৬ । এই ভিসাটি স্পন্সরড ওয়ার্ক ভিসা হিসেবে পরিচিত, যা কোনো ইতালিয়ান নিয়োগকর্তা বা স্পন্সরের সাপোর্টে পাওয়া যায়।
বাংলাদেশ থেকে ইতালিতে যাওয়ার স্বপ্ন দেখা অনেকেরই। কিন্তু এই পথে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে – জটিল প্রক্রিয়া, কাগজপত্রের ঝামেলা এবং খরচের চাপ। তবে সঠিক তথ্য জেনে নিলে এগুলো সহজ হয়ে যায়। এই লেখায় আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব ইতালি স্পন্সর ভিসা ২০২৬ আবেদনের সময়, প্রক্রিয়া, খরচ এবং প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস নিয়ে। যদি আপনি কাজের উদ্দেশ্যে ইতালি যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাহলে এই গাইডটি আপনার জন্যই। চলুন, শুরু করি।
ইতালি স্পন্সর ভিসা ২০২৬ আবেদনের সময়
ইতালি স্পন্সর ভিসা ২০২৬ হলো একটি নন-ইইউ সিটিজেনদের জন্য ডিজাইন করা ওয়ার্ক পারমিট ভিসা। এটি Decreto Flussi নামক ইতালির বার্ষিক ইমিগ্রেশন প্ল্যানের অংশ। এই ভিসার মাধ্যমে আপনি ইতালিতে ৯ মাস থেকে ২ বছর পর্যন্ত কাজ করতে পারবেন, যা পরে রিনিউ করা যায়। স্পন্সর হিসেবে ইতালির কোনো কোম্পানি বা নিয়োগকর্তা আপনার জন্য Nulla Osta (ওয়ার্ক পারমিট) আবেদন করে।
বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য এটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কারণ ইতালির অর্থনীতিতে শ্রমিকের অভাব রয়েছে। ২০২৬ সালে ১ লক্ষ ৬৫ হাজার কোটার মধ্যে বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার শ্রমিক যাওয়ার সুযোগ আছে। এই ভিসা পেলে আপনি না শুধু ভালো আয় করবেন, বরং ইউরোপীয় জীবনযাত্রার অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন। তবে, আবেদনের সময় মিস করলে সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাবে। তাই সময়সূচী মেনে চলা জরুরি।
ইতালি স্পন্সর ভিসার প্রকারভেদ
ইতালি স্পন্সর ভিসা ২০২৬ দুই ধরনের হতে পারে: সিজনাল (ঋতুকালীন) এবং নন-সিজনাল (সারা বছরের)। সিজনাল ভিসা কৃষি বা ট্যুরিজম খাতে ৯ মাসের জন্য, যখন নন-সিজনাল নির্মাণ বা সার্ভিস খাতে দীর্ঘমেয়াদী। বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য উভয়ই উপলব্ধ, কিন্তু স্পন্সরের সাথে মিলিয়ে বেছে নিন।
ইতালি স্পন্সর ভিসা ২০২৬ আবেদনের সময়সূচী
আবেদনের সঠিক সময় জানা না হলে সব প্রস্তুতি বৃথা যায়। ২০২৬ সালে ইতালি স্পন্সর ভিসা আবেদন শুরু হবে এপ্রিল মাস থেকে, কিন্তু Decreto Flussi এর অধীনে স্পেসিফিক তারিখগুলো নিম্নরূপ। সিজনাল কোটার জন্য আবেদন খুলবে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সকাল ৯টায়, যার ৭০% কোটা। বাকি ৩০% পরবর্তীতে। নন-সিজনালের জন্য ওয়েব পোর্টাল খোলে ৩ এপ্রিল ২০২৬ থেকে।
বাংলাদেশ থেকে আবেদনের জন্য VFS Global-এর মাধ্যমে যেতে হবে। ২০২৬ সালের শেষভাগে, ডিসেম্বর মাসে অতিরিক্ত কোটা খুলতে পারে, যেমন ২ ডিসেম্বর, ৪ ডিসেম্বর এবং ৮ ডিসেম্বর। এই তারিখগুলোতে আবেদনের উইন্ডো খুলবে, যা মাত্র কয়েক দিনের। তাই প্রস্তুতি আগে থেকে নিন। আবেদনের লিমিট ১ লক্ষ ৩৬ হাজার শ্রমিক, তাই দ্রুততা দেখান।
আবেদনের উইন্ডো কতদিন খোলা থাকে?
প্রত্যেক উইন্ডো ২-৩ দিনের, কিন্তু কোটা ফুল হলে বন্ধ হয়ে যায়। ২০২৫ সালে মোট কোটা ১ লক্ষ ৬৫ হাজার, যার মধ্যে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য প্রায় ৫-১০% বরাদ্দ থাকতে পারে। ইতালির দূতাবাস ঢাকা থেকে মনিটর করুন।
ইতালি স্পন্সর ভিসা আবেদন প্রক্রিয়া
আবেদন প্রক্রিয়া জটিল মনে হলেও, সঠিকভাবে ফলো করলে সহজ। প্রথমে স্পন্সর (ইতালির নিয়োগকর্তা) Nulla Osta আবেদন করে। এটি পাওয়ার পর আপনার টার্ন।
ধাপ ১: স্পন্সরের প্রস্তুতি
স্পন্সরকে ইতালির স্পোর্টেলো ইউনিকো পোর্টালে Nulla Osta আবেদন করতে হবে। এতে চাকরির বিবরণ, বেতন (ন্যূনতম ১২০০ ইউরো/মাস) এবং কনট্রাক্ট থাকবে। প্রক্রিয়া ৩০-৬০ দিন লাগে।
ধাপ ২: অনলাইন আবেদন ফর্ম পূরণ
VFS Global-এর ওয়েবসাইট থেকে ফর্ম ডাউনলোড করুন। সকল তথ্য ইংরেজিতে পূরণ করুন: ব্যক্তিগত ডিটেইলস, শিক্ষা, কাজের অভিজ্ঞতা। ভুল হলে রিজেক্ট হবে।
ধাপ ৩: অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুকিং এবং জমা
ঢাকার VFS সেন্টারে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন। কাগজপত্র জমা দিন এবং ফি পে করুন। বায়োমেট্রিক্স (ফিঙ্গারপ্রিন্ট) দিন।
ধাপ ৪: ইন্টারভিউ এবং ওয়েটিং
ইতালির দূতাবাসে ইন্টারভিউ হতে পারে। প্রক্রিয়া ১৫-৪৫ দিন লাগে। অ্যাপ্রুভ হলে পাসপোর্টে ভিসা স্ট্যাম্প।
ধাপ ৫: ইতালিতে আগমন এবং রেসিডেন্স পারমিট
ইতালি পৌঁছে ৮ দিনের মধ্যে Permesso di Soggiorno আবেদন করুন। এটি ছাড়া কাজ করা যাবে না।
ইতালি স্পন্সর ভিসা ২০২৬ এর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
কাগজপত্র ছাড়া আবেদন অসম্ভব। সব অরিজিনাল এবং ফটোকপি রাখুন।

মৌলিক ডকুমেন্টস
- বৈধ পাসপোর্ট (কমপক্ষে ৬ মাসের বৈধতা)।
- ৪ কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি (সাদা ব্যাকগ্রাউন্ড)।
- জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি।
- জন্ম সনদ এবং বিবাহ সনদ (যদি প্রযোজ্য)।
শিক্ষা এবং দক্ষতা প্রমাণ
- শিক্ষাগত সার্টিফিকেট (এসএসসি/এইচএসসি/গ্র্যাজুয়েশন)।
- IELTS বা ইংরেজি দক্ষতার প্রমাণ (ন্যূনতম ৫.৫ স্কোর)।
- কাজের অভিজ্ঞতার সার্টিফিকেট (যদি থাকে)।
ফিনান্সিয়াল এবং স্পন্সর প্রমাণ
- স্পন্সরের লেটার এবং Nulla Osta।
- ব্যাংক স্টেটমেন্ট (৩ মাসের, ন্যূনতম ৫০০০ ইউরো ব্যালেন্স)।
- চাকরির অফার লেটার এবং কনট্রাক্ট।
- ট্রাভেল ইন্স্যুরেন্স (৩০,০০০ ইউরো কভারেজ)।
অতিরিক্ত ডকুমেন্টস
- পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট।
- মেডিকেল ফিটনেস সার্টিফিকেট (TB টেস্ট সহ)।
- যদি প্রবাসী হন, তাহলে প্রবাসী প্রমাণ।
সব ডকুমেন্ট ইংরেজি বা ইতালিয়ানে ট্রান্সলেট করান এবং নোটারাইজ করান।
ইতালি স্পন্সর ভিসা ২০২৬ এর খরচ বিস্তারিত
খরচের হিসাব না রাখলে সমস্যা হয়। মোট খরচ ৪-৫ লক্ষ টাকা হতে পারে, এজেন্সি ব্যবহার করলে ১০-১২ লক্ষ।
অফিসিয়াল ফি
- ভিসা অ্যাপ্লিকেশন ফি: ৯,২০০ টাকা (শর্ট টার্ম), ১৩,৩৪০ টাকা (লং টার্ম)।
- VFS সার্ভিস চার্জ: ৩,৮০০ টাকা।
- ব্যাংক ড্রাফট চার্জ: ২৭০ টাকা।
অন্যান্য খরচ
- ডকুমেন্ট প্রস্তুতি: ২০,০০০-৩০,০০০ টাকা (ট্রান্সলেশন, মেডিকেল)।
- ট্রাভেল টিকিট এবং ইন্স্যুরেন্স: ৫০,০০০-৭০,০০০ টাকা।
- এজেন্সি ফি (ঐচ্ছিক): ৩-৫ লক্ষ টাকা।
- মোট: ন্যূনতম ৪০,০০০-৫০,০০০ টাকা (সেল্ফ অ্যাপ্লাই)।
খরচ কমাতে সরাসরি VFS-এ যান, এজেন্সি এড়ান।
ইতালি স্পন্সর ভিসা ২০২৬ এর টিপস এবং সতর্কতা
- আগে থেকে স্পন্সর খুঁজুন: LinkedIn বা ইতালিয়ান জব পোর্টাল ব্যবহার করুন।
- ভাষা শিখুন: ইতালিয়ান ভাষার বেসিক কোর্স করুন।
- স্ক্যাম এড়ান: শুধু অফিসিয়াল চ্যানেল ব্যবহার করুন।
- প্রস্তুতি: IELTS এবং মেডিকেল আগে করুন।
- রিজেকশন এড়াতে: সব তথ্য সঠিক রাখুন, ফিনান্সিয়াল প্রুফ শক্তিশালী করুন।
এই টিপস মেনে চললে সাফল্যের সম্ভাবনা বাড়বে।
প্রশ্ন-উত্তর সেকশন
সিজনালের জন্য ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ , নন-সিজনালের জন্য ৩ এপ্রিল ২০২৫ থেকে। ডিসেম্বরে অতিরিক্ত উইন্ডো থাকতে পারে।
পাসপোর্ট, ছবি, Nulla Osta এবং ফিনান্সিয়াল প্রুফ অপরিহার্য।
অফিসিয়াল ফি ৯,২০০-১৩,৩৪০ টাকা, মোট ৪-৫ লক্ষ টাকা।
কারণ জেনে আবার আবেদন করুন, অথবা অ্যাপিল করুন দূতাবাসে।
ইতালি স্পন্সর ভিসা ২০২৫ বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য একটি সোনার সুযোগ। সঠিক সময়ে, সঠিক প্রস্তুতিতে আবেদন করলে আপনার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেবে। মনে রাখবেন, ধৈর্য এবং পরিকল্পনা সাফল্যের চাবি। আজই প্রস্তুতি শুরু করুন এবং ইতালির দরজা খুলে দিন নিজের জন্য। সাফল্য কামনা করি!


