আপনি কি উন্নত ভবিষ্যতের আশায় হংকং যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন? এশিয়ার অন্যতম ধনী এই দেশটিতে কাজের সুযোগ এবং উচ্চ বেতন অনেক বাংলাদেশি তরুণ-তরুণীর স্বপ্ন। তবে সঠিক তথ্যের অভাবে অনেকেই প্রতারণার শিকার হন বা ভুল সিদ্ধান্ত নেন। আপনার মনে নিশ্চয়ই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—হংকং কাজের বেতন কত টাকা এবং ২০২৬ সালে নতুন ভিসা নিয়মগুলো কী কী?
এই আর্টিকেলে আমরা হংকংয়ের বর্তমান বেতন কাঠামো, ভিসা পাওয়ার নিয়ম, জীবনযাত্রার খরচ এবং নতুন সব আপডেট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। আপনি যদি হংকংয়ে ক্যারিয়ার গড়তে চান, তবে এই গাইডটি আপনার জন্যই। চলুন, জেনে নেওয়া যাক বিস্তারিত।
হংকং কাজের বেতন কত টাকা ২০২৬
হংকংয়ে কাজের বেতন মূলত নির্ভর করে আপনার দক্ষতা, কাজের ধরন এবং অভিজ্ঞতার ওপর। ২০২৬ সালে হংকং সরকার এবং শ্রম বিভাগ প্রবাসী কর্মীদের জন্য বেতনের নতুন কাঠামো নির্ধারণ করেছে। বিশেষ করে ডোমেস্টিক হেল্পার বা গৃহকর্মীদের জন্য ন্যূনতম বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে।
সাধারণত, হংকংয়ে দুই ধরনের কাজের সুযোগ বেশি থাকে: দক্ষ (Skilled) এবং অদক্ষ (Unskilled)। নিচে বিভিন্ন কাজের আনুমানিক মাসিক বেতনের একটি তালিকা দেওয়া হলো, যা আপনাকে ধারণা পেতে সাহায্য করবে।
বিভিন্ন পেশায় গড় বেতনের তালিকা
নিচের টেবিলে দেওয়া বেতন হংকং ডলার (HKD) এবং বাংলাদেশি টাকায় (BDT) আনুমানিক হিসেবে দেখানো হলো (বিনিময় হার পরিবর্তনশীল):
| কাজের ধরন | মাসিক বেতন (HKD) | মাসিক বেতন (BDT – আনুমানিক) |
| ডোমেস্টিক হেল্পার (FDH) | ৫,১০০ – ৬,৫০০ | ৮০,০০০ – ১,০২,০০০ টাকা |
| কনস্ট্রাকশন বা নির্মাণ শ্রমিক | ১৫,০০০ – ২৫,০০০ | ২,৩৫,০০০ – ৩,৯২,০০০ টাকা |
| ফ্যাক্টরি বা প্রোডাকশন ওয়ার্কার | ১৩,০০০ – ১৬,০০০ | ২,০৪,০০০ – ২,৫১,০০০ টাকা |
| রেস্টুরেন্ট বা হোটেল কর্মী | ১২,০০০ – ১৮,০০০ | ১,৮৮,০০০ – ২,৮২,০০০ টাকা |
| আইটি বা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার | ২৫,০০০ – ৫০,০০০+ | ৩,৯২,০০০ – ৭,৮৫,০০০+ টাকা |
| নার্স বা কেয়ারগিভার | ২০,০০০ – ৩০,০০০ | ৩,১৪,০০০ – ৪,৭০,০০০ টাকা |
বিশেষ দ্রষ্টব্য: হংকং কাজের বেতন কত টাকা তা জানার পাশাপাশি মনে রাখবেন, হংকং সরকার গৃহকর্মীদের জন্য ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ন্যূনতম বেতন (Minimum Allowable Wage) ৫,১০০ হংকং ডলার নির্ধারণ করেছে। এর সাথে খাবার খরচ বাবদ আলাদা ১,২৩৬ ডলার পাওয়া যায় যদি মালিক খাবার না দেন।
হংকং কাজের ভিসা ২০২৬ ক্যাটাগরি ও সুযোগ
২০২৬ সালে হংকং সরকার বিদেশি কর্মীদের জন্য বেশ কিছু ভিসার সুযোগ রেখেছে। তবে বাংলাদেশিদের জন্য সব ক্যাটাগরিতে ভিসা পাওয়া সহজ নয়। প্রধানত যে ভিসাগুলো প্রচলিত, সেগুলো নিচে আলোচনা করা হলো। হংকং কাজের ভিসা ২০২৬ সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকলে আপনি সহজেই নিজের ক্যাটাগরি বেছে নিতে পারবেন।
১. ফরেন ডোমেস্টিক হেল্পার (FDH) ভিসা
বাংলাদেশি নারীদের জন্য এই ভিসাটি সবচেয়ে সহজলভ্য এবং জনপ্রিয়। হংকংয়ের পরিবারগুলোতে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করার জন্য এই ভিসা দেওয়া হয়।
- সুবিধা: থাকা-খাওয়া ফ্রি, সাপ্তাহিক ছুটি এবং উচ্চ বেতন।
- চুক্তি: সাধারণত ২ বছরের চুক্তি থাকে, যা পরে নবায়ন করা যায়।
২. জেনারেল এমপ্লয়মেন্ট পলিসি (GEP) – প্রফেশনালস
আপনার যদি উচ্চশিক্ষা (যেমন ব্যাচেলর ডিগ্রি) এবং বিশেষ দক্ষতা থাকে, তবে আপনি GEP ক্যাটাগরিতে আবেদন করতে পারেন। আইটি, ফিন্যান্স, ইঞ্জিনিয়ারিং বা টিচিং পেশায় যারা দক্ষ, তাদের জন্য এটি সেরা অপশন।
- শর্ত: ভিসার আবেদনের আগেই হংকংয়ের কোনো কোম্পানি থেকে জব অফার লেটার থাকতে হবে।
৩. সাপ্লিমেন্টারি লেবার স্কিম (SLS)
এই স্কিমের আওতায় কনস্ট্রাকশন, কেয়ারগিভার বা কৃষিকাজের মতো সেক্টরে শ্রমিক নেওয়া হয়। তবে এই প্রক্রিয়ায় সরাসরি আবেদন করা কঠিন; সাধারণত এজেন্সির মাধ্যমে বা সরকারি চুক্তির আওতায় নিয়োগ হয়।
৪. টপ ট্যালেন্ট পাস স্কিম (TTPS)
যারা বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করেছেন অথবা যাদের বার্ষিক আয় অনেক বেশি, তাদের জন্য এই বিশেষ ভিসা চালু করা হয়েছে। এটি মূলত উচ্চবিত্ত এবং হাইলি স্কিলড প্রফেশনালদের জন্য।
হংকং ভিসা পাওয়ার নিয়ম ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
হংকং যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে আপনাকে সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। হংকং কাজের ভিসা ২০২৬ পাওয়ার জন্য স্বচ্ছ ও নির্ভুল কাগজপত্র জমা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। কোনো দালালের প্রলোভনে না পড়ে নিজেই নিয়মগুলো জেনে নিন।
আবেদনের ধাপসমূহ (Step-by-Step)
- জব অফার সংগ্রহ: প্রথমে হংকংয়ের কোনো বৈধ নিয়োগকর্তা বা এজেন্সির মাধ্যমে কাজের অফার লেটার পেতে হবে।
- চুক্তিপত্র স্বাক্ষর: নিয়োগকর্তার সাথে স্ট্যান্ডার্ড এমপ্লয়মেন্ট কন্ট্রাক্ট (SEC) স্বাক্ষর করতে হবে।
- ইমিগ্রেশনে আবেদন: নিয়োগকর্তা আপনার হয়ে হংকং ইমিগ্রেশন ডিপার্টমেন্টে ভিসার আবেদন করবেন।
- ভিসা অনুমোদন: সব কাগজপত্র ঠিক থাকলে ৪-৬ সপ্তাহের মধ্যে ভিসা বা এন্ট্রি পারমিট ইস্যু হয়।
- বিএমইটি ক্লিয়ারেন্স: বাংলাদেশ থেকে যাওয়ার আগে ম্যানপাওয়ার কার্ড ও সরকারি ছাড়পত্র নিতে হবে।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
- মেয়াদসহ মূল পাসপোর্ট (কমপক্ষে ৬ মাস মেয়াদ)।
- পূরণকৃত ভিসা আবেদন ফর্ম (ID 988A)।
- নিয়োগকর্তার সাথে স্বাক্ষরিত কাজের চুক্তিপত্র।
- শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার সনদ (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)।
- মেডিক্যাল ফিটনেস সার্টিফিকেট।
- পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট।
- পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি।
টিপস: হংকং ভিসা প্রসেসিংয়ের সময় কোনো মিথ্যা তথ্য দেবেন না। হংকং ইমিগ্রেশন খুবই কড়াকড়ি, সামান্য ভুলেও ভিসা বাতিল হতে পারে।
হংকংয়ে জীবনযাত্রার খরচ ও বাসস্থানের সুবিধা
বেতন বেশি হলেও হংকং বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল শহর। তাই হংকং কাজের বেতন কত টাকা, তার পাশাপাশি খরচের হিসাবটাও মাথায় রাখা জরুরি। নতুবা মাস শেষে সঞ্চয় করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
- বাসস্থান (Rent): হংকংয়ে বাসা ভাড়া আকাশচুম্বী। সাধারণ শ্রমিকরা অনেক সময় শেয়ারিং রুম বা ডরমিটরিতে থাকেন। তবে ডোমেস্টিক হেল্পারদের জন্য থাকার খরচ নেই, কারণ মালিকের বাসায় থাকাই নিয়ম।
- খাবার খরচ: আপনি যদি নিজে রান্না করে খান, তবে মাসে ১,৫০০ – ২,০০০ হংকং ডলারের মধ্যে হয়ে যাবে। বাইরের খাবার বেশ দামী।
- যাতায়াত: হংকংয়ের পাবলিক ট্রান্সপোর্ট (MTR, বাস) খুবই উন্নত এবং খরচ হাতের নাগালেই। মাসে ৫০০-৮০০ ডলারে যাতায়াত সম্ভব।
মোটামুটি হিসাব: একজন সাধারণ শ্রমিকের থাকা-খাওয়া বাদে মাসে ৩,০০০ – ৪,০০০ হংকং ডলার খরচ হতে পারে। তবে যারা ফ্রি থাকা-খাওয়ার সুবিধা পান (যেমন গৃহকর্মী), তারা বেতনের প্রায় পুরো টাকাই দেশে পাঠাতে পারেন।
হংকং যাওয়ার আগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
অনেক সময় দালালরা “হংকংয়ে ফ্রি ভিসা” বা “গিয়েই লাখ টাকা বেতন” বলে প্রলোভন দেখায়। মনে রাখবেন, হংকংয়ে কোনো “ফ্রি ভিসা” নেই। ভিজিট ভিসায় গিয়ে সেখানে কাজ করা সম্পূর্ণ অবৈধ এবং ধরা পড়লে জেল-জরিমানা ও ডিপোর্ট নিশ্চিত।
- এজেন্সি যাচাই: সরকার অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে আবেদন করুন।
- ভিসা চেক: ভিসা হাতে পাওয়ার পর ইমিগ্রেশন ওয়েবসাইট থেকে এর সত্যতা যাচাই করে নিন।
- ভাষা: ইংরেজি ভাষা জানা থাকলে হংকংয়ে কাজ পাওয়া ও চলাফেরা করা অনেক সহজ হয়। ক্যান্টোনিজ ভাষা শিখলে বাড়তি সুবিধা পাওয়া যায়।
জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
সরকারিভাবে বা সঠিক এজেন্সির মাধ্যমে গেলে খরচ অনেক কম, সাধারণত ৩ থেকে ৪ লাখ টাকার মধ্যে হয়ে যায় (ভিসা ক্যাটাগরি ও এজেন্সি ভেদে কমবেশি হতে পারে)। তবে দালালরা ৬-৭ লাখ টাকা পর্যন্ত দাবি করতে পারে, যা থেকে সাবধান থাকা উচিত।
বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে সরাসরি কনস্ট্রাকশন ভিসায় যাওয়া কিছুটা সীমিত। তবে সরকারি জি-টু-জি (G2G) প্রক্রিয়া বা বিশেষ এজেন্সির মাধ্যমে মাঝে মাঝে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি আসে। নিয়মিত খবর রাখা জরুরি।
সাধারণত প্রথমবার ২ বছরের ভিসা দেওয়া হয়। এরপর কাজের চুক্তির ওপর ভিত্তি করে মেয়াদ বাড়ানো যায়।
মুদ্রার মান পরিবর্তনশীল। বর্তমানে ১ হংকং ডলার (HKD) সমান বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১৫.৫০ থেকে ১৬.০০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করে।
না, একদমই না। হংকংয়ে টুরিস্ট বা ভিজিট ভিসায় গিয়ে কোনো প্রকার কাজ করা দণ্ডনীয় অপরাধ। ধরা পড়লে জেল এবং ভবিষ্যতে আর কখনোই হংকং যাওয়ার সুযোগ থাকবে না।
হংকং একটি সম্ভাবনাময় শ্রমবাজার, যেখানে সততা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে ভাগ্য পরিবর্তন করা সম্ভব। হংকং কাজের বেতন কত টাকা এবং হংকং কাজের ভিসা ২০২৬ সম্পর্কে সঠিক তথ্য জেনে প্রস্তুতি নিলে প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে না। উচ্চ বেতন এবং উন্নত জীবনমান পেতে চাইলে হংকং নিঃসন্দেহে একটি চমৎকার গন্তব্য।
তবে তাড়াহুড়ো না করে, সঠিক নিয়ম মেনে এবং দক্ষতা অর্জন করে আবেদনের পরামর্শ রইল। আপনার বিদেশ যাত্রা সফল ও নিরাপদ হোক।


